বাজারে উঠেছে হাঁড়িভাঙা আম, দাম চড়া

প্রথম পাতা » ছবি গ্যালারী » বাজারে উঠেছে হাঁড়িভাঙা আম, দাম চড়া
শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪



বাজারে উঠেছে হাঁড়িভাঙা আম, দাম চড়া

রংপুরে প্রতি বছর জুনের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে বাজারে পাওয়া যায় স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় আঁশহীন সুমিষ্ট হাঁড়িভাঙা আম। তবে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাতকরণের আগেই রংপুরের বিভিন্ন বাজারে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত এই আমের বিক্রি শুরু হয়েছে। দাম কিছুটা চড়া হলেও হাঁড়িভাঙার স্বাদ নিতে ভিড় বেড়েছে হাট-বাজারগুলোতে। এই আম ঘিরে চাষি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।

বর্তমানে আকারভেদে প্রতি মণ হাঁড়িভাঙা আম ২ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ বছর প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির বাগানে হাঁড়িভাঙার ফলন হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে দেড়শ কোটি টাকার ওপরে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি হবে বলে জানিয়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

হাঁড়িভাঙার মৌসুমে আমের সবচেয়ে বড় হাট বসে রংপুরের পদাগঞ্জ হাটে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। শুক্রবার (২১ জুন) পদাগঞ্জের হাটে সকাল থেকেই অটোরিকশা, ভ্যান ও পিকআপে করে আসতে থাকে ক্যারেটে ক্যারেটে আম। অনেকেই হাটের রাস্তায় সাইকেল ও ভ্যানে ক্যারেটে আম নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আম বেচতে দেখা গেছে। ক্রেতাদের সরব উপস্থিতিতে জমজমাট হয়ে উঠেছে আমের বেচাকেনা।

পদাগঞ্জ ছাড়াও রংপুরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সড়ক, সিটি বাজার, লালবাগ, মডার্ন মোড়, ধাপ বাজার, শাপলা চত্বরসহ নগরীর বিভিন্ন হাট-বাজারে উঠতে শুরু করেছে এই আম। হাট-বাজার ছাড়াও নগরীর বিভিন্ন অলিগলি ও মোড়ে মোড়ে ফেরি করে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করতে দেখা গেছে। তবে প্রতিবারের মতো এবারও শুরুতেই আমের চড়া দাম চাইছেন বিক্রেতারা।

এদিকে ক্রেতারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার আমের দাম একটু বেশি। তবে আকারভেদে দামের পার্থক্য থাকায় কেউ কেউ স্বস্তির কথাও জানিয়েছেন।

আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, হাঁড়িভাঙার ভালো ফলন হওয়ায় অল্প লাভেই বেশি বিক্রির আশা করছেন তারা। তবে এ বছর হাঁড়িভাঙা আমের ফলন ভালো হলেও অনাবৃষ্টি-অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে আমের আকার খুব বেশি বড় হয়নি।

এদিকে আম পাড়া ও বাজারে সরবরাহকে ঘিরে ব্যস্ততা বেড়েছে আম চাষি, ব্যবসায়ী, পরিবহন সংশ্লিষ্টদের। আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড় সাইজের আমের মণ পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায়। মাঝারি সাইজের আমের মণ ২ হাজার ২০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। আর ছোট সাইজের আম বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা মণে। তবে খুচরা বাজারে এর দাম আরও বেশি। কাঁচা আমের তুলনায় আবার পাকা আমের দাম কম। এ ক্ষেত্রে গাছ পাকা আম হলে আবার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

পদাগঞ্জ এলাকার আম ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার আমের আকার কিছুটা ছোট হয়েছে। তবে ফলন আশানুরূপ। এবার আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেকেই ২০ জুনের আগেই আম পাড়া শুরু করেছে। আমের আকার বা সাইজ ভেদে প্রতিমণ আম সর্বনিম্ন ২ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। তীব্র গরম না থাকলে অর্থাৎ সহনীয় তাপমাত্রা থাকলে আমের বাজার কিছুটা বেশি হয় বলেও জানান এই ব্যবসায়ী।

বাস টার্মিনাল এলাকায় আম কিনতে আসা এসএম ইকবাল সুমন বলেন, অপেক্ষায় ছিলাম কবে হাঁড়িভাঙা আম বাজারে আসবে। আজকে হাঁড়িভাঙা আম পাওয়া যাবে জেনে এখানে আম নিতে এসেছি। আমের দাম স্বাভাবিক রয়েছে। তবে আর একটু কম হবে মনে করেছিলাম। এই আমের স্বাদটা ভালো লাগে তাই পরিবারের সবাই বেশি করে খাওয়ার চেষ্টা করি।

অনলাইনে আম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হাঁড়িভাঙা অনলাইন সার্ভিস আইডিয়াটিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও তরুণ উদ্যোক্তা সরকার মনজুরুল মান্নান বলেন, কয়েক বছর ধরে অনলাইনে আমের অর্ডার নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে তা সরবরাহ করছি। এবার শুরুর দিনেই ১‌৫ মণ আমের অর্ডার পেয়েছি। আজ প্রতি মণ আম আকার ভেদে সর্বনিম্ন ২ হাজার ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ টাকা করে অর্ডার নেওয়া হয়েছে। এসব আম রংপুরের বাইরে পাঠাতে ক্যারেট, প্যাকিং ও কুরিয়ার মিলে বাড়তি খরচ রয়েছে।

এদিকে মিঠাপুকুর উপজেলার আখিরাহাট, খোড়াগাছ, পদাগঞ্জ, মাঠেরহাট, বদরগঞ্জের ওসমানপুর, গোপালপুর, নাগেরহাট, সর্দারপাড়া, রংপুর নগরের বড়বাড়ী, সদর উপজেলার সদ্যপুস্করণী ইউনিয়নের কাটাবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিশাল বিশাল বাগানে সারি সারি আম গাছ। জনপ্রিয়তার কারণে এখন রংপুরের তারাগঞ্জ, নীলফামারী সদর, সৈয়দপুর, দিনাজপুরের পার্বতীপুর, খানসামা, চিরিরবন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এই আমের বাগান। ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এসব বাগান।

রংপুরের হাঁড়িভাঙা আমের যেমন খ্যাতি রয়েছে, তেমনি চাহিদাও তুঙ্গে। বিদেশেও রফতানি হয় এই আম। হাঁড়িভাঙা চাষ করে অনেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় তড়িঘড়ি করে আম বিক্রি করায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন তারা। হাঁড়িভাঙ্গা পাকলে এই আম ৩-৪ দিনের বেশি রাখা যায় না। সংরক্ষণের জন্য নেই কোনো পদ্ধতি। এই আম সংরক্ষণ করার প্রক্রিয়া চাষিরা পেলে স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও পাঠানো সহজ হতো- এমনটাই মনে করছেন আমচাষিরা।

এদিকে হাঁড়িভাঙা আম সংরক্ষণে গবেষণা জরুরি বলে দাবি করে চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এই আম পরিবহনের জন্য বিশেষ বাস ও ট্রেন সার্ভিস চালু করা দরকার। একই সঙ্গে ন্যায্য দাম নিশ্চিতকরণে প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে। হাঁড়িভাঙা আমের রাজধানী খ্যাত পদাগঞ্জ হাটের রাস্তাঘাটের সংস্কার এবং হাটে আম বিক্রির শেড নির্মাণ, ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ানো, পাবলিক টয়লেট স্থাপন ও বৃষ্টির সময় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার জোর দাবি তাদের।

টেকসই অর্থনীতির জন্য হিমাগার স্থাপন, আধুনিক আমচাষ পদ্ধতি বাস্তবায়ন, গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনসহ পদাগঞ্জ হাটের সংস্কারের দাবি জানান হাঁড়িভাঙা আমের সম্প্রসারক আব্দুস সালাম সরকার। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকার প্রধানের উদ্যোগে দেশ-বিদেশে হাঁড়িভাঙা আম রপ্তানি শুরু হয়েছে। আমরা এতে খুশি। তবে আর একটু দৃষ্টি দিলেই হাঁড়িভাঙাকে ঘিরেই এই অঞ্চলের অর্থনীতি আরও সচল হবে। এজন্য সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষি বিপণন ও পরিবহন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন জানান, হাঁড়িভাঙা আম সংরক্ষণে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণা করছে। তবে কবে নাগাদ গবেষণার ফলাফল পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এই আমের লাইফলাইন নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে গবেষণামূলক কাজ করা হচ্ছে। হাঁড়িভাঙা আম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, এ কারণে সংরক্ষণে গবেষণার দাবি এখন আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে।

তিনি আরও জানান, চলতি বছর জেলায় ৩ হাজার ৩৫৯ হেক্টর জমিতে আমের চাষাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাঁড়িভাঙার চাষাবাদ হয়েছে ১ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে। এ বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৯ হাজার ৭১০ মেট্রিক টন। শুরুর দিকে প্রতি কেজি আম ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হয়ে থাকে। তবে আমের আকার ও পরিস্থিতির অনেক সময় দামের হেরফের হয়।

এদিকে শুক্রবার বিকেলে রংপুর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে পদাগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে হাঁড়িভাঙা আম মেলা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান বলেন, হাঁড়িভাঙা আমের বাজারজাত করতে যাতে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয় তা মনিটরিং করা হবে। বিশেষ করে পরিবহনে ব্যবসায়ীদের যেন কোনো হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সরকারি পরিবহন সুবিধার বিষয়টিও দেখা হবে।

জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলে হাঁড়িভাঙা আমের ফলন বেশি হলেও ফজলি, সাদা ল্যাংড়া, কালা ল্যাংড়া, মিশ্রিভোগ, গোপালভোগ, আম্রপালিসহ আরও নানা প্রজাতির আম উৎপাদন হয়ে আসছে। এসব আমের ভিড়ে এখন সবচেয়ে বেশি চাহিদা হাঁড়িভাঙার। সম্প্রতি হাঁড়িভাঙা আম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৮:১৪:১৮   ১৩১ বার পঠিত  




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

ছবি গ্যালারী’র আরও খবর


দেশে ইলেকশন আনার চেষ্টা করতেছি আমি একা : ফজলুর রহমান
রূপগঞ্জে যুবলীগ নেতা গ্রেপ্তার
তরুণদের ‘থ্রি-জিরো’ ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে তৈরির আহ্বান জানালেন ড. ইউনূস
জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বিএনপি প্রস্তুত: গিয়াসউদ্দিন
রূপগঞ্জে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুট, ১০ জনকে কুপিয়ে জখম
অপরাধীদের ধরতে চাষাড়ায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন
বিমসটেকের আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে যোগ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা
সাতক্ষীরায় প্লাবিত এলাকায় নৌবাহিনীর জরুরি ত্রাণ ও মেডিকেল সহায়তা প্রদান
পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব সময় আন্তরিক সরকার : সুপ্রদীপ চাকমা
শহীদ আনাসের পরিবারের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন শারমীন এস মুরশিদ

News 2 Narayanganj News Archive

আর্কাইভ